চন্দননগর ভ্রমণ

শনিবার রাত্রি। প্রাক্তন সিনিয়র এর সাথে দেখা করতে অনেক দেরি হয়ে গেলো। সিনিয়র যদি কর্মক্ষেত্রে পরিচিত হলেও অনেকটা নিজের হয়ে যায়, তাহলে সত্যি ই সময়ের হিসেব থাকেনা। যাইহোক, রাত করে বাড়ি ফিরে আবার কিছু সাংসারিক কাজ নিয়ে বসলাম। তার মধ্যেই মাথার মধ্যে ঝিলিক মারছিল ছোট্ট কোথাও ঘুরে আসার প্ল্যান। গুগল এ দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম যে এরা ফুটেজের চক্করে দিঘা কে কলকাতার পার্শ্ববর্তী এলাকায় রূপান্তর করেছে। কিন্তু যেতেই ৫ ঘণ্টা , আর কালকে অফিস ও আছে। সুতরাং বেজায় বিড়ম্বনা। কোথায় যাওয়া যায় ? প্রথমে ভাবলাম বুরুল এর নাম শুনেছি, ওখানেই যাওয়া যাক। তারপর খুঁজলাম আশেপাশের দেখার জায়গা। অথচ সেরম কিছু পেলাম না। অগত্যা প্রিয়তম ভাই কে ফোন। ও সটান বলে দিলো " চন্দন নগর থেকে ঘুরে এসো।" তারপর স্বভাবওচিত ভঙ্গিতে বলল " ডুপ্লে সাহেব দেখো তোমাদের সাথে হয়তো ফুচকা ও খাবেন। "

চন্দননগর সম্বন্ধে বলে দি, দু এক কথা। জগদ্ধাত্রী পুজো এবং ফ্রেঞ্চ তথা ফরাসি কলোনি , এক্কেবারে খাপে খাপ, যাকে বলে। সেই থেকেই নাম হয়, ফরাসডাঙ্গা । কলকাতা থেকে ২ ঘণ্টা মতো লাগবে আপনি যদি কমফোর্ট ড্রাইভিং করেন তো। এবার , যাবো কিসে? পকেট গড়ের মাঠ, প্রয়োজনীয় হিসেব ছাড়া খরচ করতে গেলে চাপ , কারণ এখনো মাসিক দক্ষিণা আসেনি। সুতরাং বউ এর ওপর পুরো ভরসা। তাই বেছে নিলাম , আমার শ্রদ্ধেয় শ্বশুরমশাই এর নীল রঙ্গা মারুতি ৮০০ কে। ২০ বছর বয়স , এখনো অনেক নতুন ৩ সিলিন্ডার কে বলে বলে গোল দেবে। আমার এক সহকর্মীর ভাষায় , একদম চাবুক গাড়ি। এ সি নেই, কিন্তু ঘুরতে যাচ্ছি এটাই গরম কে মোকাবিলা করবে। 

রবিবার সকাল দশ টা। ঘুম ভাঙ্গলো শেষে। গতরাতে একটু ভূরিভোজ হওয়াতে রবিবার দিন টা তার সাথে যোগ্য সংগত দিয়েছে। বাইরে রোদ্দুর , গরম হাওয়া, এর মধ্যে যাবো ? কিন্তু সংকল্প বড় কঠিন জিনিস। বিশেষত সেটা যদি গৃহিণীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতে হয়, তাহলে তো যেতেই হবে। অতঃপর, দেরি না করে, স্নান করে বেড়িয়ে পড়ব ভাবলাম। কিন্তু সে গুরে বালি, স্রেফ স্যান্ড। এতটাই ক্লান্ত থাকি আমার দুজনে , আর তার সাথে ল্যাদ এর পূর্ণ মাত্রায় সংমিশ্রণ এ, আরো দেরি হলো এবং অবশেষে আমরা দুপুর ১টায় রওনা হয়ে গেলাম। 

রুবি, চিংড়িহাটা হয়ে উল্টোডাঙ্গা পেরিয়ে খালপাড় দিয়ে টালা সেতুর দিকে অগ্রসর হচ্ছি, হঠাৎ প্রথম জ্যাম, বুঝলাম যে গলিফ স্ট্রিট এ তখনও কেনাবেচা চলছে। কারণ অনেকেই কাঁধে বা হাতে , ফুল গাছ বা পোষ্য পাখি নিয়ে আসছিলেন। ৫ মিনিট ঘেমে নেওয়ার পর যখন ভাবছি জল খেতেই হবে একটু, গাড়ি এগোতে শুরু করলো। বরানগর চত্বরে , ডানলপ অবধি আমার অফিস যাওয়ার রাস্তা, তাই চেনা ছিল। দক্ষিণেশ্বর হয়ে বালি পেরোনোর পর ই শুরু হলো আসল পরীক্ষা। ভাগ্যিস গাড়ি র স্টিয়ারিং থেকেই মাথা ঘুরিয়ে দক্ষিণা কালী মা কে প্রণাম করে নিয়েছিলাম। বালি হল্ট না বলি হল্ট বোঝা দায়। রাস্তার যা ছিরি, মনে হচ্ছিল পুরোনো গাড়ি তার ধকল নিতে পারবেনা। সেই দুঃস্বপ্নের শেষ হতেই ডানকুনি পেরিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম গন্তব্যের অভিমুখে। মিনিট ২০ যাওয়ার পর বুঝলাম , পেটে ছুঁচো র দল , যাকে বলে হাইপার এক্টিভ হয়ে উঠেছে। কিছু দূরে একটি ধাবা কাম পারিবারিক রেস্টুরেন্ট, নাম " আহারে বাহার " , তাই আর দেরী না করে গাড়ি লাগিয়ে দিলাম। মিক্সড ভেজ , ডাল মাখানি ও বাটার নান সহযোগে পেটপুজো বেশ ভালই হল। তারপর ভাই এর পূর্ব নির্দেশমতো কেশর বাদাম। গা টা জুড়িয়ে যাচ্ছে যখন, তখন বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিয়ে আবার বেরোলাম চন্দন নগর এর পথে। ২ নং জাতীয় সড়ক ছেড়ে পড়লাম একটি মেঠো পথ, সংক্ষেপে বা তাৎপর্য যাকে বাইপাস বলে। সেটা পেরিয়ে আর ১৫ মিনিট এ পৌঁছে গেলাম কাঙ্খিত স্থান এ। 

ফরাসি উপনিবেশ এর স্মৃতি চারিধারে ছড়িয়ে আছে , অন্তত গঙ্গা নদীর কূল বরাবর। প্রথমেই গেলাম ডুপ্লে সংগ্রহশালা তে । সেই যুগের মিনিয়েচার ম্যাপ, মুদ্রা, প্রিন্টিং মেশিন , এবং শয়নকক্ষ দেখে যখন অভিভূত আমরা , তখন ই চোখে পড়ল পেছনের বাগান টি । যথাযথ যত্ন করার ফলে সেই বাগান হয়ে গেলো আমাদের দেবা দেবীর ছবির তোলার স্পট, বাকিদের মতোই। এখানে জানিয়ে রাখি, ডুপ্লে সংগ্রহশালা তে ভারতীয় নাগরিক দের ৫ টাকা টিকিট, এবং ব্যাগ মোবাইল লকার এ জমা করে প্রবেশ করতে হয়। 

পরবর্তী লক্ষ্য, চন্দননগর স্ট্রান্ড । অনেকেই ছবির তোলে, আমি তাকিয়েছিলাম গঙ্গা নদীর বহমান স্রোতের দিকে. নৌকা ও চলছিল, তবে এ যাত্রায় সেটা বাদ ই দিলাম। ম্যাপ দেখে বুঝলাম উল্টোদিকে ভাটপাড়া - নৈহাটি। কাজের সুত্রে যাই মাঝে সাঁঝে তাই ভালো লাগাটা আরেকটু বাড়ল। এরপর শেষ গন্তব্য, আজকের জন্য ছিল চন্দননগর এর সেক্রেড হার্ট চার্চ, যা নির্মিত হয় ১৬৯১ সালে। মানে প্রথাগত ভাবে , আমার শহর কলকাতার থেকে মাত্র এক বছরের ছোট বয়সে। চার্চ এ প্রার্থনা চলছিল, তাই আর প্রবেশাধিকার ছিলনা। বেড়িয়ে, গিন্নি একটা আইস ক্রিম এবং আমি এক কাপ চা খেয়ে এবার বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি মানে কলকাতার উদ্দেশ্যে । 

ফেরার পথে আর সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। তবে হ্যাঁ , ফেরার পর , দুজনকেই ও আর এস খেতে হয়েছে, কারণ গরমে প্রায় যায় যায় অবস্থা। তবে এরম ছোট ট্রিপ মাসে ২ বার অন্তত করতে পারলে মন টাও ভালো থাকে। কাল থেকে আবার অফিস, সুতরাং , আবার দেখা হবে কোনো লেখার মাধ্যমে। 


Comments