এবার চন্দ্রকেতুগড় - ধান্যকুরিয়া
শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে ছোটবেলার মতো সরস্বতী পূজা অবধি টেনেই দেবে। দিক। আমরা যারা গ্রীষ্মের দাবদাহে প্রতিবার অতিষ্ঠ হই, তাতে প্রকৃতির ইচ্ছে তে আরো কদিন ফ্রি ফান্ড এ ঠান্ডা উপভোগ করাই যেতে পারে।
তো এই শীতকালে ঘুরতে যাওয়া টাই শ্রেয় মনে করি। বেশ ফিরে এসেও তার রেশ টা থেকে যায়। বাকিদের ভিন্ন মত হতেই পারে। যাহোক, ঘোরা বা ঘুরতে যাওয়ার কথা যখন হলো, তখন সেটা স্বল্পমেয়াদি হলেও মন টাকে অনেকটা উজ্জীবিত করে। এরম এক ট্যাকটিক হচ্ছে লং ড্রাইভ , আমার মতে। অনেকে আছেন যারা সারা ভারতবর্ষ কিংবা পৃথিবী ভ্রমণ করেন বাইক এ বা গাড়ি তে। আমি আরো অনু-মেয়াদি কথা বলছি। শহরের জঙ্গল থেকে ধরুন ৭০ কিমি র মধ্যে কোনো জায়গা , যেখান এক দিন এ গিয়েই দিনে ফেরা যায়। এবার কর্মক্ষেত্রে এই মুহূর্তে ছুটি ও নেই আবার মন টাও উরু উরু , মনে পড়লো যে আমি গাড়ি চালাতে জানি। না মানে এই 104 এর উর্ধে যাওয়ার পর থেকেই না আমি ড্রাইভিং এর বিষয়বস্তু সম্বন্ধে একটু বিস্মৃত ই হয়ে গেছি।
মনের সুপ্ত বাসনার শেষমেশ কার্যকরণ হলো আজ। আমার বেটার হাফ , আমার স্ত্রী এর সঙ্গে অনেকদিন কোথাও যাইনি, শুধু আমরা দুজন। তাই শেষ পর্যন্ত লং ড্রাইভ এ যাবোই এ সিদ্ধান্ত নিলাম।
বেরিয়ে তো পড়তাম , কিন্তু কোথায় যাবো ? কোলাঘাট বা শক্তিগড়, এবারে ওই দুই কেন্দ্র কেই রেহাই দিলাম। ঠিক করলাম যাবো আজ চন্দ্রকেতুগড়। নামটার মধ্যেই এক মোহময়ী কুহক আছে। খৃষ্টপূর্ব চারশো বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা। যারা ইতিহাস ভালোবাসেন তারা জানবেন কেমন একটা শিহরণ জাগে সেই অজানা কে জানতে।
গুগল এই পেয়ে গেলাম বেরাচাঁপা র আশেপাশেই , চন্দ্রকেতুগড় ছাড়া আরও কিছু দর্শনীয় জায়গা হলো কচুয়া তে লোকনাথ ধাম ও ধান্যকুরিয়া ।
এবার বাকি যা জেনেছি তা সব ফেসবুক এর সাপ্তাহিক ভ্রমণ সংক্রান্ত গ্রুপ থেকে। তারা অতিব সদয় / সদয়া ব্যক্তি, আমাদের সাথে বার্তালাপ এ তারা আমাদের অনেক কিছু দিক নির্দেশ করে দিয়েছেন।
এবার ভাড়া করতে হবে গাড়ি। আমার নিজের গাড়ি বলতে আমাদের বাড়ির পুরাতন মারুতি ৮০০ । বাড়ির খুব প্রিয় কিন্ত বয়স এখন ২২ এর দোরগোড়ায়। সুতরাং ভাড়া গাড়ি। ও অবশ্যই সেলফ ড্রিভেন। কারণ গাড়ি চালিয়ে একটা আলাদা আনন্দ পাওয়া যায়। তাই কালবিলম্ব না করে গত পরশু Zoomcar থেকে গাড়ির বুকিং করি। মারুতি ওয়াগন আর , ১৪৪ ফ্রি কিমি ও ৮ ঘন্টার জন্য টাকা দিলাম ১২৯২/- । তেল লেগেছে আলাদা ১০০০ এর।
আজ সকালে Zoomcar থেকে বাড়িতে হোম ড্রপ ছিল গাড়ির। গাড়িটি সত্যি অসাধারণ কন্ডিশনে ছিল । পুরো মাখন, যাকে বলে। আমরা ৮টায় বেরিয়ে তেল ভরে বাইপাস দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। সায়েন্স সিটি ক্রস করতেই একটা ভয় জাপটে ধরলো। রাজারহাট দিয়ে বেরোব, যদি অফিসে ডেকে নেয়। সেই ভয় ঘনীভূত হলো সামনে বিশ্ব বাংলা গেট দেখতে পেয়ে । ব্যাস, আর রেহাই নেই। কিন্তু বরাত ভালো। বনা ঝনঝট এই নিউটাউন পেছনে ফেলে আমরা রাজারহাট রোড ধরে খরিবাড়ি সরণির দিকে এগিয়ে গেলাম।
রাস্তায় বিশেষ কিছু হয়নি। কেবল মজাখাল সেতু র পরে একটা দোকান এর নাম চোখে পড়ল।
" ফালতু টি সেন্টার"। কেউ যে যত্ন করে নিজেকে খাটো করবে তা মনে হলো না। কিন্তু নেগেটিভ পাবলিসিটি র এই মহা নমুনা দেখে আপ্লুত হলাম যে এরম নাম মনে দাগ কাটবেই। যারা উপদেশ দিয়েছিলেন, তারা বলেছিলেন রাস্তার অবস্থা খারাপ। হয় এর ই মধ্যে সরকার থেকে "দুয়ারে রাস্তা" প্রকল্পের ঝুলি সাজিয়ে বসেছে , নয় তো গাড়ির সাসপেনশন ও সকার অভুতপূর্ব সার্ভিস দিয়েছে। কারণ যা রাস্তা খারাপ পেয়েছি , তা রুবি হইতে রাসবিহারী যারা ডেইলি প্যাসেঞ্জার তাদের পক্ষে দৈনন্দিন ব্যাপার। দেখতে দেখতে দেগঙ্গা পৌঁছে গেলাম। বলে রাখি এখানে অনেক জায়গায় রাস্তা এ কাজ হচ্ছে তাই গাড়ির গতি অনেকটাই কমে রাখতে হলো।
দেগঙ্গা পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই রাস্তা আমাদের বাম দিকে ঘুরতে বললো। চন্দ্রকেতুগড় এর রাস্তা। প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা টি লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা চারদিকে। একজন এর কথা মিলে গেল। দুটি প্রমান সাইজের গাছ , সম্ভবত গতবছর ইয়াস এর পর থেকেই ভূপতিত । কিন্তু আমাদের সরকার, পেগাসুস এ ব্যস্ত, সময় কোথায় এতদিন আগের এক ঐতিহ্য কে সময় দেওয়ার ? এবং বঙ্গের সরকার ও নৈব নৈব চ। বোধয় এটা কেন্দ্র করে কোনো ভোট এর বালাই নেই, তাই গাইড ছেড়ে দিন, একটা ভদ্রস্থ জায়গায় ফলক অবধি নেই। গেটের বাইরে থেকেই ক্যামেরা যে জুম করে ছবি তুলে এ যাত্রায় ক্ষান্ত হলাম। কিন্তু ঘড়ি তে সবে দশটা পাঁচ। বিকেল ৪টে অবধি গাড়ির বুকিং। সামঞ্জস্য দিয়ে পেট্রোল ও ভরিয়েছি। সদ্ব্যবহার না করলে নিজেকে কেমন একটা ভারতীয় করদাতা র মতো নিষ্ফল মনে হয়। তাই আগামী গন্তব্যস্থল ধান্যকুরিয়া।
ধান্যকুরিয়া গুগল ম্যাপ অনুযায়ী ওখান থেকে ১০ কিমি । ভিড়ে ভিড়াক্কার রাস্তায় ট্রাক আর মোটর ভ্যান এর উপদ্রব কাটিয়ে যখন ধান্যকুরিয়া আমাদের সামনে হাতছানি দিচ্ছে, তখনই ডাক পড়ল। পেটের। খিদে পেয়েছে জব্বর। প্রায় ৬০ কিমি রাস্তা পেরিয়েছি আমরা, ভিড় এড়াতে কোথাও দাঁড়াইনি বললেই চলে। সুতরাং ধান্যকুরিয়ার ফিলমেনা বিদ্যালয় এর উল্টোদিকে এক পুরোনো মিষ্টির দোকান এর সামনে ডুবন্ত তেল এ কচুরি র লুটোপাটি দেখে নিজেকে সংবরণ করতে পারলাম না। বরঞ্চ মনে হলো যে নিজেকে এই ক্ষুধা নিবারণ এর চান্স থেকে বঞ্চিত করলে আমার পেটে এর পরিশ্রুত গ্যাস ও আমাকে শান্তি দেবে না। অতএব ছোলার ডাল সহযোগে চার চারটে কচুরি সাবড়ানোর সময় মনে হলো যে সামনে স্কুল আর উল্টোদিকে কচুরি চপ এর দোকান। কি প্রতীকী, তাই না ! স্কুল বন্ধ আর গড়ে নম্বর প্রদান, ভবিষ্যৎ টা বেশি ময়ান দেওয়া খাস্তা কচুড়ির মতো ঝুরঝুরে হলেও কিছু করার নেই। সবই নিমিত্ত। সবই মায়া। ভক্ষণ পর্ব শেষ করে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চললাম ১০ গজ এর মধ্যে গায়েন বাড়ি। জমিদার বাড়ি। সামনে প্রকান্ড লোহার গেট , পাশেই নহবৎখানা, একটু এগিয়ে একপাশে রাসমঞ্চ, বাড়ির উঠোনের ওপারে মা দুর্গা র জন্য নাটমন্দির। এখনো পুজো হয়। এবং সারা বাড়িতে নাকি ১৫১ খানা ঘর যাচ্ছে, প্রত্যেকটা এক এক করে জ্ঞাতির। এমনি তে ঢোকার অনুমতি দেয়না। কিন্তু আমরা আবার কর্মক্ষেত্র দিয়ে পরিষেবা দিতে সিদ্ধহস্ত। না না খারাপ কিছু না, কাস্টমার সার্ভিস এর কাজ করে গেলাম সারা জীবন, সেই কথাই বলছি আর কি। তাই মিষ্টি কথায় পটিয়ে ও প্রস্থান এর সময় গান্ধীজির একটা বেগুনি রঙের ছবি হাতে গুঁজে দিয়ে কার্য সম্পন্ন করলাম। এবার সামনে এগিয়ে গেলাম গাড়ি নিয়ে। রাস্তা র ডানদিকে পড়লো সাহু দের জমিদার বাড়ি , আর তারপরেই উল্টোপার অর্থাৎ বামদিকে পড়লো বল্লভ দের জমিদার বাড়ি। এই পরিবার এর এক উদীয়মান পুরুষ যিনি পরে শ্যামবাজার অঞ্চলে বিখ্যাত হন, তিনি হলেন শ্যমাচরণ বল্লভ। প্রসঙ্গত একটা কথা মনে হলো, এত গুলো জমিদার বাড়ি এখানে অথচ এই জায়গাটার সার্বিক উন্নতি তেমন কিছুই হয়নি। অবশ্য ওনাদের থেকে কিছু আশা করাও উচিত নয়। খোদ সরকার বাহাদুর আজ ইচ্ছে মতো নিমেষে লোককে নাগরিক থেকে উদ্বাস্তু বানিয়ে দিচ্ছে, ঢং করে সিটিজেন এক্ট এর নামে, এরা অন্তত কিছু খুব সুন্দর বিদ্যালয় বানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এমনি পরিহাস, পাল্লা দিয়ে টিউশন চললেও স্কুল তো বন্ধ। তাই আজ ফুটবল মাঠ টাও ফাঁকা। মনে হলো এক অদৃশ্য ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর প্রহর গুনছে।
এসব এ আর মন খারাপ করলামনা। এগিয়ে গেলাম সত্যজিৎ রায় এর পার্ক এর দিকে। ও হরি , এতো দেখছি কলকাতা র রবীন্দ্র সরোবর লেক কে ৪ ভাগ এ কেটে তার একটা ভাগ কে পার্ক বলে অভিহিত করেছে। দুধারে মাছের ভেড়ি। ফুল দিয়ে সামনেটা সাজানো। তার সাথে বিশ্ব বাংলার "ব" এর প্রতিকৃতি। কাজ তেমন না হলেও আজকের যুগে ব্র্যান্ডিং টা যুৎসই হয়েছে। পার্ক বন্ধ। কোভিড এর কারণে। যদিও আমাদের ঠিক আগেই ,একদল কলকাকলিতে সম্পূর্ণ ছেলেমেয়ে, কলেজের ই হবে তারা ঝোপ লক্ষ করে এগিয়ে গেল। কি করবে আর কেনই বা ঝোপ এর দিকে গেল, তা নিয়ে না ভেবে আমরা খানিকটা বিফল মনোরথ হয়েই ফেরার রাস্তা ধরলাম। বোধয় কোনো মহাপুরুষের জীবনী নিয়ে কথা হবে বা নিছক আড্ডা।
ঘড়ি তে তাকিয়ে দেখি , গতবছর এর পেয়াঁজ এর দাম এর থেকেও সময় তাড়াতাড়ি পেরিয়ে গেছে। প্রায় একটা বাজে। রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি। ওয়াগন আর টাকে হুডখোলা জিপ আর নিজেকে রাজেশ খান্না ভাবতে যাচ্ছি, হঠাৎ বিভ্রাট। গাড়ির একদম সামনে এক সারমেয়, গোদা বাংলায় কুকুর চলে এসেছে। ৭০ কিমি প্রতি ঘন্টা বেগ কে যে কিকরে পর্যুদস্ত করে সেই নিষ্পাপ প্রাণীর জীবন রক্ষা করলাম তা ভগবান ই জানেন। কারণ আর একচুল জায়গা থেকে সরলে আজ আমার আর আমার স্ত্রী এর সলিল সমাধি হয়ে যেত নিচের খাল এ। তখন আমরা বেলিয়াঘাটা সেতু র ওপরে ছিলাম। যাহোক, আর কিছু তেমন হয়নি । দেখতে দেখতে এসে পড়লাম আবার নিউটাউন। দুপুর দুটো, মাথার ওপর সূর্য, ও পেট আবার "মিত্রন" বলে বিস্বাসঘাতকের মতো জোর ডাকাডাকি শুরু করেছে। একবার মনে হলো যাই, অফিসের কাছেই চলে যাই। আর কিছু না হোক, ডিম টোস্ট পেয়ে যাব। হঠাৎ ভগবান আমার দিকে মুখ তুলে চাইলেন। নিউটাউন এর গোলকধাঁধা এর মধ্যেই রাস্তার মাথায় দেখতে পেলাম এক হার্ডিং ডানদিকে দিক নির্দেশ করছে। নিউটাউন কফি হাউস এর।
খাবার এর ব্যাপারে আমি সদা স্ট্রিট স্মার্ট। মাঝে মাঝে এতটাই যে আমার জীবনসঙ্গিনী কে বাধ্য হয়েই আমাকে থামাতে হয়। আজকে খেলাম দু প্লেট এগ স্যান্ডউইচ , ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর ব্ল্যাক কফি। দুপুর বলেই হয়তো ভিড় টা অপেক্ষাকৃত কম যদিও কলেজ স্ট্রিট এর মেন ব্রাঞ্চ এ কখনই এত সহজে সিট ফাঁকা পেতাম বলে মনে হয় না। বাংলা গান এর রিমিক্স চলছে, ছিমছাম পরিবেশ ও দারুন সক্রিয় পরিষেবা। মনের আরাম করে ও পেটের জ্বালা অবশেষে বাড়ি অভিমুখে যাত্রা।
আবার কবে বেরোতে পারবো জানিনা। সম্ভবত ফেব্রুয়ারি র শেষে। আবার হবে ঘোরা আমাদের উরণচন্ডী দ্যাবা দেবীর। আবার আসবো গল্প নিয়ে । ততদিন ঠান্ডা আর আসন্ন ব্যাঙ্গ ভ্যালেনটি পূজা র আসর এ আনন্দ করে নিন, কিন্তু মাস্ক করে। কখন পড়বেন, কোথায় পড়বেন, সেটা আপনি ই ভালো জানবেন।
শুভরাত্রি।
Comments
Post a Comment